দেশ কাঁপানো রায়! ইমান মাজারির কারাদণ্ডে কি পাকিস্তানে ভিন্নমতের দরজা বন্ধ?

Pakistan-এ ইমান মাজারির কারাদণ্ড কি ভিন্নমতের কণ্ঠরোধের ইঙ্গিত? সাম্প্রতিক রায় ঘিরে মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন।
Photo of author
SRINews

Published On:

পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যখন ভিন্নমত দমন রাষ্ট্রীয় নীতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে, ঠিক সেই সময় মানবাধিকার আইনজীবী ইমান মাজারি ও তাঁর স্বামী হাদি আলি চাত্তা-র বিরুদ্ধে ঘোষিত ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেশটির বিচারব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই রায় শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়—এটি পাকিস্তানের তথাকথিত হাইব্রিড রেজিম-এর অধীনে ডিজিটাল ভিন্নমতের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।

আইনি কৌশলের ফলে কার্যত ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলেও, এই মামলার প্রতীকী গুরুত্ব বহুগুণ বেশি। কারণ, একজন সুপ্রতিষ্ঠিত মানবাধিকার আইনজীবীর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টকে ‘সাইবার সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করা পাকিস্তানে মতপ্রকাশের সীমারেখাকে আরও সংকুচিত করল।

iman-mazari-sentenced-pakistan-dissent-freedom-question

মামলার রায়: কোন ধারায় কত সাজা?

ইসলামাবাদের একটি বিশেষ সেশন কোর্ট এই মামলায় প্রিভেনশন অফ ইলেকট্রনিক ক্রাইমস অ্যাক্ট (PECA) অনুযায়ী তিনটি পৃথক ধারায় সাজা ঘোষণা করে। রায় দেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক মুহাম্মদ আফজাল মাজোকা

সাজার বিস্তারিত (PECA অনুযায়ী)

ধারাঅপরাধের ধরণকারাদণ্ডজরিমানাঅনাদায়ে অতিরিক্ত সাজা
ধারা ৯অপরাধের মহিমান্বিতকরণ৫ বছর৫০ লক্ষ রুপি১ বছর
ধারা ১০সাইবার সন্ত্রাসবাদ১০ বছর৩ কোটি রুপি২ বছর
ধারা ২৬-এভুয়ো তথ্য প্রচার২ বছর১০ লক্ষ রুপি৬ মাস

🔹 সব সাজা একসঙ্গে কার্যকর হবে, ফলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাবাস কার্যকর হবে—যদি জরিমানা পরিশোধ করা হয়।

iman-mazari-sentenced-pakistan-dissent-freedom-question

বিচারকের পর্যবেক্ষণ: কেন এত কঠোর অবস্থান?

রায়ে বিচারক উল্লেখ করেন, অভিযুক্তরা আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানকে “টেরোরিস্ট স্টেট” বলে উল্লেখ করেছেন। আদালতের মতে—

  • এই শব্দচয়ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনগণের অনাস্থা সৃষ্টি করে
  • সেনাবাহিনীকে জোরপূর্বক গুম ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ রাষ্ট্রদ্রোহমূলক প্রভাব ফেলতে পারে
  • আইনি জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও এমন বক্তব্য দেওয়া সচেতন অপরাধ

আদালত মনে করে, এই বক্তব্যগুলো নিষিদ্ধ সংগঠন BLATTP-র বক্তব্যের সঙ্গে “আংশিক সাযুজ্যপূর্ণ”, যা ধারা ১০ (সাইবার সন্ত্রাসবাদ) প্রযোজ্য করে।

PECA আইন: ডিজিটাল ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার?

২০১৬ সালে প্রণীত PECA আইন শুরু থেকেই বিতর্কিত। তবে ২০২৫ সালের সংশোধনী এই আইনকে আরও কঠোর করে তোলে।

কেন এই আইন ভয়ংকর?

  • ধারা ১০ অত্যন্ত অস্পষ্ট—রাষ্ট্রীয় সমালোচনাকেও ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়
  • ধারা ৯-এর মাধ্যমে মতাদর্শগত মিলকেও অপরাধে রূপ দেওয়া সম্ভব
  • সরকারের হাতে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের অসীম ক্ষমতা

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী এই রায়কে PECA আইনের “প্রথম সফল প্রয়োগ” বলে স্বাগত জানিয়েছেন—যা সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে।

iman-mazari-sentenced-pakistan-dissent-freedom-question

কে এই ইমান মাজারি?

ইমান জাইনাব মাজারি-হাজির (৩২) এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, একজন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত মানবাধিকার আইনজীবী।

তাঁর পরিচিতি

  • বেলুচিস্তানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মামলা
  • সংখ্যালঘু ও রাজনৈতিক বন্দিদের আইনি সহায়তা
  • ২০২৫ সালে World Expression Forum – Young Inspiration Award

তিনি পাকিস্তানের প্রাক্তন মানবাধিকারমন্ত্রী শিরিন মাজারি-র কন্যা হলেও, সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের কড়া সমালোচক হিসেবেই পরিচিত।

আদালত বয়কট ও অনুপস্থিতিতে রায়

শুনানির একপর্যায়ে ইমান ও হাদি আদালত বয়কট করেন। অভিযোগ—

  • আদিয়ালা জেলে অমানবিক পরিবেশ
  • পর্যাপ্ত খাবার ও পানির অভাব

তবুও আদালত In Absentia রায় দেয়। বিচারকের যুক্তি—

“আসামি স্বেচ্ছায় শুনানি বর্জন করলে আদালত রায় দিতে পারে।”

এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থায় বিতর্কিত নজির হয়ে থাকল।

দেশ-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া

এই রায় নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে নিন্দার ঝড়।

“এটি মানবাধিকার কর্মীদের নীরব করার প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ।”
— Amnesty International

“আইনের নামে ভিন্নমত দমন পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী।”
— Human Rights Commission of Pakistan

কূটনৈতিক স্তরেও চাপ বাড়ছে। নরওয়েজিয়ান রাষ্ট্রদূত শুনানি পর্যবেক্ষণ করায় পাকিস্তান সরকারের কড়া আপত্তি দেশটির GSP+ সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

ইমান মাজারি ও হাদি আলি চাত্তার সাজা প্রমাণ করে—পাকিস্তানে এখন ডিজিটাল ভিন্নমত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ
যখন সমালোচনা ‘সন্ত্রাসবাদ’ হয়ে যায়, তখন বিচারব্যবস্থা নাগরিক অধিকার রক্ষার বদলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

Leave a Comment