SIR: গণতন্ত্রের পীঠস্থান হলো নির্বাচন, আর সেই নির্বাচনের মেরুদণ্ড হলো স্বচ্ছ ভোটার তালিকা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটে সেই ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াতেই বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠল। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের তদন্তের পর, নজিরবিহীনভাবে সাসপেন্ড করা হলো বসিরহাট-২ ব্লকের বিডিও (BDO) সুমিত্র প্রতিম প্রধানকে। কমিশনের এই কড়া পদক্ষেপে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি।
ঘটনার সূত্রপাত:
শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ ঘটনার সূত্রপাত হয় বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে। তিনি অভিযোগ করেন, বসিরহাট-২ ব্লকে ভোটার তালিকা সংশোধনের (Special Intensive Revision) মতো সংবেদনশীল কাজে সরকারি বিধি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। শুভেন্দু দাবি করেন, বিডিও সুমিত্র প্রতিম প্রধান সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ‘চুক্তিনির্ভর কর্মীদের’ (Contractual Staff) দিয়ে ভোটার তালিকার শুনানি করাচ্ছেন। বিরোধী দলনেতার মতে, শাসকদলের সুবিধার্থে “বুথ স্তরে রিগিং” নিশ্চিত করতেই ২২ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এই বেআইনি প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছিল।
কমিশনের তদন্ত ও আইনি লঙ্ঘন
বিষয়টি নজরে আসতেই নড়েচড়ে বসে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI)। তদন্তে দেখা যায়, বিডিও-র বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য। ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের (Representation of the People Act, 1950) ১৩সি ধারা অনুযায়ী, শুধুমাত্র গেজেটেড অফিসাররাই সহকারী নির্বাচক পঞ্জীকরণ আধিকারিক (AERO) হিসেবে কাজ করতে পারেন। কিন্তু বসিরহাটে এই নিয়ম ভেঙে, সরকারি বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই অন্তত ১১ জন ব্যক্তিকে ‘অতিরিক্ত এআইআরও’ হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল, যাদের এই কাজ করার আইনি কোনো এখতিয়ার নেই।
কমিশনের কড়া দাওয়াই: সাসপেনশন ও শুনানি বাতিল
প্রশাসনিক এই গাফিলতিকে “গুরুতর বিচ্যুতি” (Grave Lapse) হিসেবে চিহ্নিত করে কমিশন তাৎক্ষণিক কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে:
১. বিডিও সাসপেন্ড: বসিরহাট-২ ব্লকের বিডিও সুমিত্র প্রতিম প্রধানকে অবিলম্বে সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
২. শুনানি বাতিল: ওই ১১ জন অননুমোদিত ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত সমস্ত শুনানি এবং সিদ্ধান্তকে “null and void” বা শুরু থেকেই বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
৩. নতুন শুনানি: বাতিল হওয়া শুনানিগুলো পুনরায় স্বচ্ছভাবে গ্রহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৪. মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ: স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ভিন রাজ্য থেকে ‘মাইক্রো রোল অবজার্ভার’ নিয়োগ করা হচ্ছে, যারা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে নজরদারি চালাবেন।
সাধারণ ভোটারদের করণীয়
বসিরহাট-২ ব্লকের বাসিন্দাদের জন্য এই খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনার ভোটার তালিকার শুনানি গত ২২ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬-এর মধ্যে হয়ে থাকে, তবে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। আপনার নাম তালিকায় সঠিক আছে কি না তা নিশ্চিত করতে নতুন শুনানির নোটিশের দিকে নজর রাখুন। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে গিয়ে স্ট্যাটাস চেক করুন।
নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করল, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনো ধরণের অস্বচ্ছতা বরদাস্ত করা হবে না। প্রশাসনের এই শুদ্ধিকরণ আগামী নির্বাচনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।









