মানুষ ছাড়াই লেনদেন, সিদ্ধান্ত নেবে যন্ত্র! ২০২৬-এ ব্লকচেইন ও AI বদলে দিচ্ছে অর্থনীতির চেহারা

২০২৬ সালে ব্লকচেইন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যৌথভাবে কীভাবে বিশ্ব অর্থনীতির খোলনলচে বদলে দিচ্ছে, জানুন এই বিশেষ প্রতিবেদনে।
Photo of author
SRINews

Published On:

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে একটা কথা হলফ করে বলা যায়—ব্লকচেইন প্রযুক্তি এখন আর শুধুমাত্র বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সির ওঠানামার গল্প নয়। এটি আজ ডিজিটাল অর্থনীতির অদৃশ্য মেরুদণ্ড। গত কয়েক বছরে আমাদের চোখের আড়ালেই ঘটে গেছে এক নীরব বিপ্লব।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এবং ব্লকচেইনের সংযুক্তি এমন এক যুগের সূচনা করেছে, যেখানে মানুষের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছাড়াই বড় বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত, চুক্তি এবং লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু আইটি সেক্টরে আটকে নেই; আপনার ব্যাঙ্কিং থেকে শুরু করে জমির দলিল, এমনকি স্বাস্থ্য পরিষেবা—সবই এখন এই ‘অটোমেটেড’ বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার অধীনে চলে আসছে।

এজেন্টিক ইকোনমি (Agentic Economy): মানুষের হয়ে সিদ্ধান্ত নিবে AI

আমরা এতদিন এআই-কে চিনতাম মানুষের নির্দেশ পালনকারী একটি সাধারণ সফটওয়্যার হিসেবে। কিন্তু ২০২৬-এর প্রযুক্তি বিশ্বে এআই এখন আর নিছক ‘টুল’ নয়, তারা হয়ে উঠেছে ‘স্বায়ত্তশাসিত এজেন্ট’ বা অটোনোমাস এনটিটি। সহজ কথায়, এদের নিজস্ব ডিজিটাল পরিচয় এবং ‘অন-চেইন ওয়ালেট’ বা ডিজিটাল মানিব্যাগ রয়েছে।

স্মার্ট কন্ট্রাক্ট সই করা থেকে শুরু করে জটিল লেনদেন—মানুষের অনুমতি ছাড়াই এরা কাজ করতে সক্ষম। অর্থনীতিবিদেরা একেই বলছেন ‘এজেন্টিক ইকোনমি’ (Agentic Economy), যেখানে দুটি মেশিন বা এআই এজেন্ট একে অপরের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য করছে, কোনো মানুষের মধ্যস্থতা ছাড়াই।

স্বয়ংক্রিয় লেনদেন ও এআই-এর কার্যপদ্ধতি

এই ব্যবস্থার কারিগরি দিকটি বেশ চমকপ্রদ। ধরুন, আপনি আপনার এআই এজেন্টকে শুধু লক্ষ্য বলে দিলেন—”কম ঝুঁকিতে আমার পুঁজি থেকে সর্বোচ্চ মুনাফা বের করো।” ব্যস, আপনার কাজ শেষ। বাকিটা করবে ওই এজেন্ট। সে নিজেই বিভিন্ন ব্লকচেইনে সুযোগ খুঁজবে, প্রয়োজনে এক নেটওয়ার্ক থেকে অন্য নেটওয়ার্কে (Chain Hopping) ঘুরবে এবং স্মার্ট কন্ট্রাক্ট কার্যকর করবে।

এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে—যন্ত্রের ওপর এত ভরসা কি নিরাপদ? এর উত্তর দিচ্ছে ‘ভেরিফাইয়েবিলিটি’ বা যাচাইযোগ্যতা। জিরো-নলেজ প্রুফ (Zero-Knowledge Proof) এবং অন-চেইন অডিটের মাধ্যমে সর্বক্ষণ নজর রাখা হচ্ছে যাতে ওই এজেন্ট তার নির্দিষ্ট সীমার বাইরে না যায়।

মডুলার ব্লকচেইন ও রোলআপ প্রযুক্তি: লেনদেনে নতুন গতি

প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। আগে ব্লকচেইন ছিল একশিলা বা একচেটিয়া একটি ব্যবস্থা। এখন এটি ভেঙে ‘মডুলার আর্কিটেকচার’-এ পরিণত হয়েছে। সেলেস্টিয়া (Celestia) বা পলিগন এভেইল (Polygon Avail)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ডেটা লেয়ার হিসেবে কাজ করায় লাখ লাখ মাইক্রো-ট্রানজ্যাকশন এখন অনেক সস্তা ও দ্রুত হয়েছে। বিশেষ করে জেডকে রোলআপ (ZK Rollup) প্রযুক্তির কারণে লেনদেনের ‘ফাইনালিটি’ বা নিষ্পত্তি এখন প্রায় তাৎক্ষণিক হচ্ছে, যা আগে সাত দিন পর্যন্ত সময় নিত।

বাস্তব সম্পদের টোকেনাইজেশন (RWA) ও আধুনিক বিনিয়োগ

বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ এখন আর তাত্ত্বিক কথায় সীমাবদ্ধ নেই। ফিনান্সের দুনিয়ায় রিয়েল ওয়ার্ল্ড অ্যাসেট (RWA) টোকেনাইজেশন এখন বড় বাস্তবতা। জমি-বাড়ি (রিয়েল এস্টেট), স্বর্ণ বা বন্ড—সবই এখন ডিজিটাল টোকেনে রূপান্তরিত। এর ফলে আপনি চাইলেই কোনো বিশাল সম্পত্তির খুব ছোট একটি অংশের মালিক হতে পারেন (Fractional Ownership), যা আগে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। অন্যদিকে, ‘ডিপিন’ (DePIN) বা ডিসেন্ট্রালাইজড ফিজিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে ড্রোন বা রোবটরা নিজেদের কাজের পারিশ্রমিক বা চার্জিং ফি নিজেরাই ব্লকচেইনের মাধ্যমে মিটিয়ে নিচ্ছে।

নতুন আইনি কাঠামো: জেনিয়াস অ্যাক্ট ও ক্ল্যারিটি অ্যাক্ট কী বলছে?

প্রযুক্তির এই উল্লম্ফনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনি কাঠামোতেও এসেছে কঠোরতা, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তির। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আইনগুলো এখন বিশ্বজুড়ে মানদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। ‘GENIUS Act’-এর আওতায় ডলার-ব্যাকড স্টেবলকয়েনগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এখন থেকে মাসিক অডিট এবং লাইসেন্স ছাড়া কেউ এই ব্যবসা করতে পারবে না।

পাশাপাশি, ‘CLARITY Act’ দীর্ঘদিনের সিকিউরিটি বনাম কমোডিটি বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে। পরিপক্ব ব্লকচেইন প্রজেক্টগুলোকে এখন ডিজিটাল কমোডিটি হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে। এমনকি একজেকিউটিভ অর্ডার ১৪১৭৮-এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি বা CBDC নিষিদ্ধ করায় বেসরকারি স্টেবলকয়েনের বাজার আরও চওড়া হয়েছে।

ডিজিটাল ভবিষ্যতের ঝুঁকি ও প্রস্তুতি

অবশ্য এত সুবিধার পরেও কিছু ঝুঁকি থেকে যায়। স্মার্ট কন্ট্রাক্ট হ্যাক হওয়া বা এআই-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অস্বচ্ছতা (Black Box) নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে স্যান্ডবক্স এক্সিকিউশন এবং রিয়েল-টাইম অন-চেইন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা চলছে।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই ব্লকচেইন-এআই সমন্বয় কোনো সাময়িক ট্রেন্ড নয়, এটিই আগামীর ডিজিটাল সভ্যতার ভিত্তি। যারা এই ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’, সিড ফ্রেজের নিরাপত্তা এবং নতুন আইনি কাঠামোর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন, ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে তারাই এগিয়ে থাকবেন। ডিজিটাল ভবিষ্যৎ দরজায় কড়া নাড়ছে না, বরং ঘরের ভেতরেই ঢুকে পড়েছে—আপনি প্রস্তুত তো?

Leave a Comment