অরিজিৎ সিং: প্লেব্যাক গানে ইতি? মাইক্রোফোন ছেড়ে এবার পরিচালকের আসনে অরিজিৎ সিং!

প্লেব্যাক গানে ইতি? মাইক্রোফোন ছেড়ে এবার পরিচালকের আসনে অরিজিৎ সিং!
Photo of author
SRINews

Published On:

ক্যালেন্ডারে সালটা ২০২৬। জানুয়ারি মাসের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে বিনোদন জগতে ছড়িয়ে পড়ল এক চাঞ্চল্যকর খবর—প্লেব্যাক গান থেকে অবসর নিচ্ছেন অরিজিৎ সিং। যে জাদুকরী কণ্ঠ গত দেড় দশক ধরে শ্রোতাদের আবেগে ভাসিয়েছে, সেই কণ্ঠশিল্পীই এবার ভাঙতে চলেছেন তাঁর চেনা বৃত্ত।

স্পটিফাইতে টেইলর সুইফটের মতো আন্তর্জাতিক তারকাকে পেছনে ফেলে ১৬৯ মিলিয়নের বেশি অনুরাগী নিয়ে বর্তমানে তিনি বিশ্বের শীর্ষে। সাফল্যের এই চূড়ান্ত শিখরে দাঁড়িয়ে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে অরিজিতের এমন সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং ভারতীয় বিনোদন জগতের এক বড় বিবর্তন। ২০২৫ সালে ভারত সরকারের ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত হওয়ার পরপরই তাঁর এই সিদ্ধান্ত এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জিয়াগঞ্জ থেকে মুম্বই: এক হার না মানা লড়াই

অরিজিতের সাফল্যের শিকড় লুকিয়ে আছে মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের মাটিতে। দেশভাগের সময় লাহোর থেকে শরণার্থী হয়ে আসা পরিবারের সন্তান তিনি। মা ছিলেন দক্ষ তবলাবাদক এবং দিদিমা শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী—পারিবারিক এই সাंगीতিক আবহেই তাঁর বেড়ে ওঠা। হাজারি ব্রাদার্সের কাছে ধ্রুপদী তালিম এবং মাত্র নয় বছর বয়সে সরকারি স্কলারশিপ পাওয়া ছিল তাঁর প্রতিভার প্রথম স্ফুরণ।

তবে এই যাত্রা মসৃণ ছিল না। ২০০৫ সালে ‘ফেম গুরুকুল’ রিয়েলিটি শো থেকে ষষ্ঠ স্থানে বাদ পড়েও তিনি হার মানেননি। পরবর্তীতে ‘১০ কে ১০ লে যায়ে দিল’ শো-টি জিতে সেই ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে মুম্বইয়ে নিজের প্রথম রেকর্ডিং স্টুডিও তৈরি করেন। প্রীতম বা বিশাল-শেখরের মতো সংগীত পরিচালকদের সহকারী হিসেবে কাজ করে নিজেকে তৈরি করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে ২০১৩ সালে ‘আশিকি ২’-এর মাধ্যমে ঘটে তাঁর ঐতিহাসিক উত্থান।

সাফল্যের খতিয়ান: রেকর্ড ব্রেকিং মাইলফলক

অরিজিৎ সিং কেবল একজন গায়ক নন, তিনি এই প্রজন্মের আবেগের প্রতীক। তাঁর সাফল্যের গ্রাফ দেখলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য:

  • ২০১৩: ‘তুম হি হো’ গানের মাধ্যমে জাতীয় পরিচিতি ও প্রথম ফিল্মফেয়ার জয়।
  • ২০১৮: ‘পদ্মাবত’ সিনেমার ‘বিন্তে দিল’ গানের জন্য সেরা পুরুষ গায়ক হিসেবে প্রথম জাতীয় পুরস্কার।
  • ২০২৩: ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ সিনেমার ‘কেশরিয়া’ গানের রেকর্ড ব্রেকিং স্ট্রিমিং।
  • ২০২৫: ‘লাপাতা লেডিস’-এর ‘সাজনি’ গানের জন্য ৮ম ফিল্মফেয়ার জয় (কিশোর কুমারের রেকর্ডের সমকক্ষ)।
  • ২০২৫: সংগীত ও কলার জন্য ভারত সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ প্রাপ্তি।

এবারে পরিচালকের আসনে অরিজিৎ

প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ালেও অরিজিৎ হারিয়ে যাচ্ছেন না। তিনি শুরু করছেন এক নতুন ‘জঙ্গল অ্যাডভেঞ্চার’। মহাবীর জৈনের প্রযোজনায় অরিজিৎ সিং তাঁর প্রথম প্যান-ইন্ডিয়া চলচ্চিত্র পরিচালনা করতে চলেছেন। স্ত্রী কোয়েল সিংয়ের সঙ্গে মিলে চিত্রনাট্যও লিখছেন তিনি নিজেই। ‘অলোকদ্যুতি ফিল্মস’, ‘মহাবীর জৈন ফিল্মস’ এবং ‘গড ব্লেস এন্টারটেইনমেন্ট’-এর যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হতে চলা এই প্রজেক্টে যুক্ত আছেন ‘ফুকরে’ খ্যাত মৃগদীপ সিং লাম্বার মতো ব্যক্তিত্বরা।

অরিজিৎ সম্পর্কে ৫টি অজানা তথ্য

১. ক্রীড়াপ্রেমী: তিনি সচিন তেন্ডুলকর এবং দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটার ল্যান্স ক্লুজনারের বড় ভক্ত।
২. তথ্যচিত্র নির্মাতা: ছোটবেলা থেকেই ডকুমেন্টারি তৈরির প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল।
৩. লাহোর সংযোগ: পিতৃপুরুষ লাহোর থেকে আসায় পাঞ্জাবি গানে তাঁর বিশেষ দখল রয়েছে।
৪. তবলা বাদক: গানের পাশাপাশি ধীরেন্দ্র প্রসাদ হাজারির কাছে তবলার দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
৫. স্টুডিওর রহস্য: রিয়েলিটি শো জেতার টাকায় তিনি প্রথম মিউজিক স্টুডিও বানিয়েছিলেন।

সাফল্যের শীর্ষে থেকেও অরিজিৎ এক ‘ইন্ট্রোভার্ট সুপারস্টার’। জিয়াগঞ্জের সাধারণ জীবন, ইলিশ মাছ আর ব্যাডমিন্টন খেলাতেই তিনি খুঁজে পান আনন্দ। ‘লেট দেয়ার বি লাইট ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এই মানুষটি প্রমাণ করেছেন, “সাফল্য আসবে এবং যাবে, কিন্তু মাটিতে পা দিয়ে চলাই আসল চ্যালেঞ্জ।” প্লেব্যাক থেকে তাঁর প্রস্থান ভক্তদের মনে শূন্যতা তৈরি করলেও, পরিচালক হিসেবে অরিজিতের এই নতুন ইনিংস ভারতীয় সিনেমায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে বলে আশা করা যায়।

Leave a Comment