Nipah Virus 2026: ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস শুরু হতেই বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের মানচিত্রে নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিপাহ ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই ভাইরাসকে ‘প্রায়োরিটি প্যাথোজেন’-এর তালিকার শীর্ষে রেখেছে, যার মূল কারণ এর উচ্চ মৃত্যুহার এবং কার্যকর প্রতিষেধকের অভাব। এশিয়ায় এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এখন আর শুধু আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৌশলগতভাবে বিচার করলে দেখা যায়, নিপাহর উচ্চ মৃত্যুহার এবং কার্যকর প্রতিষেধকের অভাব একে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ‘প্রায়োরিটি প্যাথোজেন’ তালিকার শীর্ষে স্থান দিয়েছে। বর্তমানের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে একটি দেশের সংক্রমণ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে অন্য মহাদেশে পৌঁছে যেতে পারে। তাই ভাইরাসের বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা এখন আর তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং একটি অনিবার্য প্রশাসনিক আবশ্যকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ার সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব কীভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছে, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ার হাই-অ্যালার্ট এবং এশিয়ার পরিস্থিতি
অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মার্ক বাটলার সম্প্রতি নাইন নেটওয়ার্ক (Nine Network) টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এশিয়ার নিপাহ পরিস্থিতির ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, অস্ট্রেলিয়া সরকার এশিয়ার প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যদিও অস্ট্রেলিয়ায় এখন পর্যন্ত নিপাহর কোনো সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি, তবুও ভারতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবের হুমকিকে ক্যানবেরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। বাটলারের মতে, যদিও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করেছে, তবুও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় বিন্দুমাত্র শিথিলতা দেখানোর অবকাশ নেই।
বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপ, যা অস্ট্রেলীয় পর্যটকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য, সেখানে নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। বালির ‘আই গুস্তি এনগুরা রাই’ (I Gusti Ngurah Rai) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের জন্য কঠোর স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অস্ট্রেলীয় সরকার বর্তমান প্রটোকল পরিবর্তনের তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা না করলেও অসুস্থ যাত্রীদের শনাক্তকরণে তাদের দীর্ঘস্থায়ী নিয়মাবলী কঠোরভাবে প্রয়োগ করছে।
অঞ্চলভেদে জনস্বাস্থ্য স্থিতির তুলনামূলক চিত্র:
| দেশ/অঞ্চল | গৃহীত পদক্ষেপ ও স্থিতি | নীতিগত যৌক্তিকতা (Rationale) |
| অস্ট্রেলিয়া | উচ্চ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং অসুস্থ যাত্রীদের জন্য কঠোর প্রটোকল। | দেশীয় সীমান্তে ভাইরাসের অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং পর্যটকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। |
| ইন্দোনেশিয়া (বালি) | আই গুস্তি এনগুরা রাই বিমানবন্দরে যাত্রীদের নিবিড় স্বাস্থ্য পরীক্ষা। | আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হওয়ায় সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি মোকাবিলা। |
| ভারত | পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালায় বিশেষ সতর্কতা; প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা। | ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের প্রাদুর্ভাব পরবর্তী গোষ্ঠী সংক্রমণ রোধ। |
| থাইল্যান্ড ও নেপাল | থার্মাল স্ক্রিনিং ও বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য ঘোষণা ফর্ম চালু। | বহির্দেশীয় যাত্রীদের মাধ্যমে ভাইরাসের আমদানি বন্ধ করা। |
কলকাতা বিমানবন্দর ও পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান চিত্র
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের দুটি সংক্রমণের ঘটনার পর ২০২৬-এর জানুয়ারিতে কলকাতা বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য দপ্তর (APHO) এক বিশেষ তৎপরতা শুরু করেছে। থাই এয়ারওয়েজ, এয়ার এশিয়া এবং মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের মতো বড় আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো এপিএইচও-র কাছে যাত্রীদের স্ক্রিনিং এবং সুরক্ষা প্রটোকল নিয়ে সুনির্দিষ্ট জানতে চেয়েছে। তবে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নেপালের বেসরকারি বিমান সংস্থা ‘বুদ্ধ এয়ার’ (Buddha Air) যদিও নেপালে স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করেছে, তারা এই বিষয়ে এপিএইচও-র সাথে কোনো যোগাযোগ করেনি।
এপিএইচও এবং এয়ারলাইনগুলোর সাম্প্রতিক বৈঠকে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা দেখা গেছে। বিমানবন্দর স্বাস্থ্য আধিকারিক স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে বহির্গামী যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত কোনো স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজন নেই। এর পেছনে রয়েছে সুশৃঙ্খল ‘কন্টাক্ট ট্রেসিং’-এর সাফল্য। গত মাসে শনাক্ত হওয়া দুই রোগীর সংস্পর্শে আসা ১৯৬ জন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তাদের প্রত্যেকের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গোষ্ঠী সংক্রমণের (Community Transmission) কোনো অকাট্য প্রমাণ না থাকায় কর্তৃপক্ষ অযথা যাত্রীদের হয়রানি করতে ইচ্ছুক নয়। তবে থাইল্যান্ড ও নেপালের মতো দেশগুলো কলকাতা থেকে আসা যাত্রীদের ওপর যেভাবে থার্মাল স্ক্রিনিং ও স্বাস্থ্য ঘোষণার কড়াকড়ি চাপিয়েছে, তা এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করছে। জনস্বাস্থ্য বনাম যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য—এই দ্বন্দ্বে কলকাতা আপাতত বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে।
নিপাহ ভাইরাস: ইতিহাস, লক্ষণ ও সংক্রমণ পদ্ধতি
নিপাহ ভাইরাসের প্রথম পরিচয় মেলে ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার শুকর খামারিদের মধ্যে এক ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মাধ্যমে। ১৯৯৯ সালে সিঙ্গাপুরে এটি ছড়িয়ে পড়েছিল মূলত মালয়েশিয়া থেকে আমদানিকৃত অসুস্থ শুকরের মাধ্যমে। যদিও এরপর ওই অঞ্চলে বড় কোনো প্রাদুর্ভাব ঘটেনি, কিন্তু ২০০১ সাল থেকে ভারত ও বাংলাদেশ এই ভাইরাসের স্থায়ী বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই এর প্রকোপ দেখা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কেন একে ‘প্রায়োরিটি প্যাথোজেন’ বলছে? এর কারণ হলো এর উচ্চ মৃত্যুহার এবং দ্রুত মহামারিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা। এটি একটি জুনোটিক (Zoonotic) রোগ, যা পশুপাখি থেকে মানুষে এবং পরবর্তীতে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। বিশেষ করে জনাকীর্ণ এবং সঠিক বায়ু চলাচলের অভাব থাকা হাসপাতাল পরিবেশে এই ভাইরাস ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। পিপিই (PPE) ব্যবহার এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অভাব এই ঝুঁকিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
নিপাহ সংক্রমণের প্রধান লক্ষণসমূহ:
- আকস্মিক তীব্র জ্বর ও অসহ্য মাথাব্যথা।
- পেশীর তীব্র ব্যথা এবং শারীরিক দুর্বলতা।
- বমি বমি ভাব ও গলা ব্যথা।
- তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব এবং মানসিক বিভ্রান্তি।
- মারাত্মক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ (Encephalitis)।
পরিশেষে, ২০২৬ সালের এই বৈশ্বিক নিপাহ সতর্কতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কোনো শিথিলতার স্থান নেই। অস্ট্রেলিয়ার সতর্কতা এবং কলকাতার বিমানবন্দরের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি—উভয়ই প্রমাণ করে যে আমরা একটি সমন্বিত ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি। আতঙ্কিত না হয়ে তথ্যের সঠিক বিশ্লেষণ এবং সরকারি প্রটোকল মেনে চলাই হবে নিপাহর বিরুদ্ধে আমাদের প্রধান লড়াই। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং সচেতনতাই পারে একটি সম্ভাব্য মহামারিকে অঙ্কুরে বিনাশ করতে।










