বেঙ্গালুরুর লংফোর্ড রোডের বিলাসবহুল অফিসে দিনভর তল্লাশি চালাচ্ছিল কেরালার আয়কর বিভাগের একটি বিশেষ দল। বাইরে যখন সবকিছু স্বাভাবিক, ঠিক তখনই অফিসের ভেতর থেকে ভেসে আসে গুলির শব্দ। দক্ষিণ ভারতের রিয়েল এস্টেট জগতের মুকুটহীন সম্রাট এবং ‘কনফিডেন্ট গ্রুপ’-এর কর্ণধার সিজে রায়ের রক্তমাখা দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়েই তিনি গুলি চালিয়েছেন। এই ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে গোটা দক্ষিণ ভারতের শিল্পমহলে।
শেষ কয়েক ঘণ্টা: কী ঘটেছিল সেই অফিসে?
টানা দুই-তিন দিন ধরে আয়কর বিভাগের তল্লাশি চলছিল সিজে রায়ের অফিসে। পুলিশের অনুমান, তিনি চরম মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। বেঙ্গালুরু পুলিশ কমিশনার সীমান্ত কুমার সিং জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। তবে রায়ের পরিবার এবং তাঁর ভাই সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, আয়কর আধিকারিকদের ক্রমাগত চাপ এবং হেনস্থার কারণেই তিনি এই চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। জানা গেছে, তিনি সবসময় একটি নির্দিষ্ট ব্রিফকেস এবং ব্যক্তিগত পিস্তল নিজের কাছে রাখতেন, যা তার নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত দেয়।
শূন্য থেকে শিখরে: এক অদম্য জেদের গল্প
সিজে রায়ের জীবন কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম ছিল না। ১৯৯৪ সালে এক শো-রুমে মারুতি গাড়ি কিনতে গিয়ে তিনি অপমানিত হয়েছিলেন। সেই জেদ থেকেই পরবর্তীতে তিনি তৈরি করেছিলেন বিশ্বের অন্যতম দামি গাড়ির সংগ্রহ। তাঁর গ্যারেজে শোভা পেত বুগাত্তি ভেরন (Bugatti Veyron), রোলস-রয়েস, ল্যাম্বরগিনি এবং কোয়েনিগসেগ আগেরার মতো বিরল সব সুপারকার। ইনস্টাগ্রামে ১.৩ মিলিয়ন ফলোয়ারের কাছে তিনি ছিলেন গ্ল্যামার ও সাফল্যের জীবন্ত প্রতীক।
ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা ও সাম্রাজ্য বিস্তার
১৯ বছর ধরে তিলে তিলে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘কনফিডেন্ট গ্রুপ’। বেঙ্গালুরুর সারজাপুর যখন নিছক গ্রাম ছিল, তখন তিনি সেখানে ২০০ একর জমি কিনে বাজি ধরেছিলেন। আজ সেই সারজাপুর বেঙ্গালুরুর অন্যতম প্রধান আইটি হাব। শুধু রিয়েল এস্টেট নয়, মালয়ালম সিনেমা প্রযোজনাতেও তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। ‘মারাক্কার’-এর মতো বিগ বাজেটের সিনেমা তাঁর অর্থায়নেই তৈরি। এমনকি ২০১৮ সালের কেরালা বন্যায় দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি মানবিকতার নজির গড়েছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতি ও তদন্ত
সিজে রায়ের মৃত্যুতে কনফিডেন্ট গ্রুপের ভবিষ্যৎ এবং দক্ষিণ ভারতের আবাসন শিল্পে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পুলিশ বর্তমানে ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষায় আছে এবং আয়কর আধিকারিকদেরও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হতে পারে বলে খবর।
একজন সফল ব্যবসায়ী, যিনি শূন্য থেকে শুরু করে হাজার কোটির সাম্রাজ্য গড়েছিলেন, তাঁর এমন করুণ পরিণতি কর্পোরেট জগতের মানসিক চাপ এবং আইনি জটিলতার অন্ধকার দিকটিকেই আবারও সামনে নিয়ে এল।










