২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি—বিশ্ব অর্থনৈতিক ইতিহাসে এই দিনটি এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি ৫,০০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করে ৫,১১১ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। এটি নিছক দামের উত্থান নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ভিতরে জমে ওঠা গভীর আস্থার সংকটের স্পষ্ট প্রতিফলন।
মাত্র ২০২৬ সালের প্রথম তিন সপ্তাহেই সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ১৭–১৮ শতাংশ। গত দুই বছরে এই মূল্যবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। বিনিয়োগকারীরা যখন শেয়ার বাজার, বন্ড এবং প্রচলিত মুদ্রার ওপর আস্থা হারাচ্ছেন, তখনই সোনা হয়ে উঠছে শেষ আশ্রয়।

কেন হঠাৎ এতটা চড়া সোনার দাম?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান র্যালির পেছনে একাধিক তাৎক্ষণিক ও কাঠামোগত কারণ কাজ করছে।
প্রধান চালিকাশক্তি
- মার্কিন সরকারের শাটডাউন আশঙ্কা: বাজেট অচলাবস্থা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন
- ডলারের দরপতন: আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন মুদ্রার ক্রমাগত অবমূল্যায়ন
- ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: বাণিজ্য যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা
এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ছেড়ে ঐতিহ্যগত নিরাপদ বিনিয়োগ—সোনার দিকে ঝুঁকছেন।
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: ‘ভয়ের সূচক’ হয়ে উঠেছে সোনা
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে সোনা আর শুধু মূল্যবান ধাতু নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে ‘ভয়ের পরিমাপক’। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা বাড়লেই সোনার দাম লাফিয়ে ওঠে।
গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে বিতর্ক, ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপের জল্পনা এবং কানাডা ও দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর সম্ভাব্য উচ্চ শুল্ক—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড়সড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ও বাজার প্রভাব
| অঞ্চল | ঘটনা | বাজারে প্রভাব |
|---|---|---|
| যুক্তরাষ্ট্র | সরকার শাটডাউন আশঙ্কা | ডলার দুর্বল, বন্ডে অনাস্থা |
| ইউরোপ/গ্রিনল্যান্ড | ভূখণ্ড দখলের হুমকি | কূটনৈতিক অস্থিরতা |
| ভেনেজুয়েলা | সামরিক হস্তক্ষেপ সম্ভাবনা | তেলের দামে অস্থিরতা |
| কানাডা/এশিয়া | উচ্চ শুল্কের হুমকি | বিশ্ব বাণিজ্যে চাপ |

‘ডিবেসমেন্ট ট্রেড’: কেন কাগুজে মুদ্রা ছেড়ে সোনার দিকে ঝোঁক?
বর্তমান বাজারে সবচেয়ে আলোচিত শব্দবন্ধ ‘ডিবেসমেন্ট ট্রেড’। এর অর্থ—উচ্চ ঋণগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলো মুদ্রার মান কমিয়ে সংকট সামলাতে চাইছে, আর সেই আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা কাগুজে মুদ্রা ও সরকারি বন্ড থেকে সরে সোনার মতো বাস্তব সম্পদে যাচ্ছেন।
জাপানের বন্ড বাজারে সাম্প্রতিক ধস এই প্রবণতার জ্বলন্ত উদাহরণ। একই ছায়া এখন মার্কিন অর্থনীতিতেও।এক বিশ্লেষকের কথায়, “সোনা হলো আস্থার উল্টো প্রতিচ্ছবি—আস্থা কমলেই সোনার দাম বাড়ে।”
উল্লেখযোগ্য বিষয়, বহু ফান্ড ম্যানেজার সোনাকে ‘ওভারভ্যালুড’ বললেও এই র্যালি থামেনি—যা সংকটের গভীরতাই তুলে ধরে।
রুপার উত্থান: সোনার ছায়ায় আরেক বিপ্লব
সোনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রুপার দামও আকাশছোঁয়া। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রুপার দাম আউন্সপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে এক সময় ১১৭ ডলারের রেকর্ড গড়ে।
কেন বাড়ছে রুপার দাম?
- শিল্প ক্ষেত্রে উচ্চ চাহিদা
- খনি ও পরিশোধন ঘাটতি
- ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সোনার বিকল্প হিসেবে রুপা বেছে নেওয়া
বিশ্বের বহু বাজারে এখন রুপার খুচরা ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার হার নজিরবিহীন। আগে যেখানে মাসে গড়ে ১৭ টন, এখন তা বেড়ে ৬০ টনে পৌঁছেছে। উদ্দেশ্য একটাই—ডলারের উপর নির্ভরতা কমানো।
বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস
- ২০২৬ শেষে সম্ভাব্য দাম: ৫,২০০–৫,৪০০ ডলার
- সুদের হার কমলে: সোনার দাম আরও বাড়তে পারে

সোনার আউন্সপ্রতি ৫,০০০ ডলার ছুঁয়ে যাওয়া শুধুই বাজারের খবর নয়—এটি এক নতুন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত। যখন মুদ্রা, ঋণ ও রাজনীতির ভিত নড়ে যায়, মানুষ ফিরে তাকায় তার সবচেয়ে পুরনো নিরাপদ সম্পদের দিকে।










