Aadhaar Update Rules: ২০২৬ থেকে আধারের নিয়মে আমূল পরিবর্তন! জানুন নতুন ফি ও আপডেটের তালিকা

২০২৬ সালে আধার কার্ডের নিয়মে আমূল পরিবর্তন আনল UIDAI। ১ অক্টোবর থেকে বাড়ছে বায়োমেট্রিক ও ডেমোগ্রাফিক আপডেটের খরচ। শিশুদের জন্য নিয়ম কী? ভোটার তালিকার সঙ্গে আধারের সংঘাত এবং পশ্চিমবঙ্গের ১.৩৬ কোটি ভোটারের ভবিষ্যৎ কী? জানুন বিস্তারিত গাইডলাইনে।
Photo of author
SRINews

Published On:

আপনার মানিব্যাগের কোণে থাকা ১২ সংখ্যার আধার কার্ডটি (Aadhaar Card) আজ আর কেবল একটি সাধারণ পরিচয়পত্র নয়। এটি এখন ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির হৃদপিণ্ড। আপনি ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলতে চান, সরকারি ভর্তুকি পেতে চান, কিংবা নিছক সিম কার্ড কিনতে চান—আধার ছাড়া গতি নেই। ইউআইডিএআই (UIDAI)-এর ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল ক্যাপ্টেন লভকেশ ঠাকুরের ভাষায়, আধার আজ ভারতের ‘কৌশলগত ডিজিটাল গেটওয়ে’।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে যেখানে আধার-ভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেন ছিল মাত্র ২৭১ কোটি, ২০২৪ অর্থবর্ষে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯,০০০ কোটিতে! এই বিশাল পরিসংখ্যানই বলে দেয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবন কতটা আধার-নির্ভর হয়ে পড়েছে। আর ঠিক এই কারণেই, আধারের সামান্য একটি যান্ত্রিক ত্রুটি বা তথ্যের গরমিল এখন আর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বড়সড় ‘সিস্টেমেটিক ইকোনমিক রিস্ক’ বা অর্থনৈতিক ঝুঁকি।

২০২৬ সালে পা রাখার আগেই আধার কার্ড নিয়ে একগুচ্ছ নতুন নিয়ম, ফি বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা প্রোটোকল চালু করেছে কেন্দ্র। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা খুঁটিয়ে দেখব সেই সমস্ত পরিবর্তন, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে আপনার পকেটে এবং নাগরিক জীবনে।

২০২৬ সালের নতুন ফি কাঠামো ও আপনার বাজেট

ক্রমবর্ধমান মুদ্রণ খরচ, উন্নত লজিস্টিকস এবং হাই-টেক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে UIDAI তাদের পরিষেবামূল্যের কাঠামো ঢেলে সাজিয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা হতে পারে, কারণ বেশ কিছু পরিষেবার খরচ প্রায় দ্বিগুণ হতে চলেছে। একজন নীতি বিশ্লেষকের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে অহেতুক পরিবর্তন করা থেকে বিরত রাখবে ঠিকই, কিন্তু দরিদ্র সীমার নিচে থাকা মানুষের জন্য এটি চাপের কারণ হতে পারে।

কবে থেকে কত বাড়ছে খরচ?

২০২৫ সালের ১ অক্টোবর এবং ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি—এই দুটি ধাপে নতুন ফি কার্যকর হবে।

বায়োমেট্রিক আপডেট (Biometric Update): আঙুলের ছাপ, চোখের মণি (Iris) বা ছবি বদলানোর জন্য ১ অক্টোবর, ২০২৫ থেকে দিতে হবে ১২৫ টাকা। আগে এটি ছিল ১০০ টাকা।

ডেমোগ্রাফিক আপডেট (Demographic Update): নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ বা লিঙ্গ পরিবর্তনের জন্য ১ অক্টোবর, ২০২৫ থেকে খরচ হবে ৭৫ টাকা, যা আগে ছিল ৫০ টাকা।

পিভিসি আধার কার্ড (PVC Card Order): নতুন বছরের শুরু অর্থাৎ ১ জানুয়ারি, ২০২৬ থেকে পিভিসি কার্ড অর্ডার করতে হলে গুনতে হবে ৭৫ টাকা

ডোরস্টেপ পরিষেবা: বয়স্ক বা অসুস্থদের জন্য বাড়িতে বসে আধার আপডেটের (Doorstep Service) খরচ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে ৭০০ টাকায়

শিশুদের বিনামূল্যে পরিষেবা

খরচ বৃদ্ধির বাজারে কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেলতে পারেন অভিভাবকরা। UIDAI একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—শিশুদের বায়োমেট্রিক আপডেট (Mandatory Biometric Update বা MBU) রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে

কেন এটি জরুরি?

শিশুদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মুখের আদল এবং আঙুলের ছাপ বদলায়। তাই ৫ থেকে ৭ বছর এবং ১৫ থেকে ১৭ বছর—এই দুই বয়সের সন্ধিক্ষণে বায়োমেট্রিক আপডেট করা বাধ্যতামূলক। সরকার চায় না টাকার অভাবে কোনো প্রান্তিক পরিবারের শিশুর আধার নিষ্ক্রিয় হয়ে যাক। কারণ, আধার নিষ্ক্রিয় হলে ওই শিশুটি স্কুলের স্কলারশিপ, মিড-ডে মিল বা উচ্চশিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই কৌশলগতভাবেই এই পরিষেবাটিকে ফি-বৃদ্ধির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

ফেস অথেন্টিকেশন ও ‘জিরো ট্রাস্ট’ মডেল

২০২৬ সালে আধারের সবচেয়ে বড় বিবর্তন হলো নিরাপত্তার আধুনিকীকরণ। ডেটা চুরির ভয় কাটাতে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে ‘জিরো-ট্রাস্ট’ (Zero-Trust) সিকিউরিটি মডেল। অর্থাৎ, কোনো ডিভাইস বা নেটওয়ার্ককেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করা হবে না।

ফেস অথেন্টিকেশন (Face Authentication): আঙুলের ছাপ অনেক সময় বয়স্কদের বা শ্রমিক শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে কাজ করে না। এই সমস্যা মেটাতে আসছে ফেস অথেন্টিকেশন। অর্থাৎ, ব্যাঙ্কে বা সরকারি অফিসে আপনার লাইভ ছবিই হবে আপনার পাসওয়ার্ড। এটি সম্পূর্ণ কন্ট্যাক্টলেস এবং নিরাপদ।

অফলাইন ভেরিফিকেশন (Offline Verification): কোথাও চেক-ইন করার সময় বা সিম কার্ড নেওয়ার সময় আধার কার্ডের ফিজিক্যাল কপি বা জেরক্স দেওয়ার দিন শেষ। এখন কিউআর কোড (QR Code) স্ক্যান করে অফলাইন ভেরিফিকেশন করা যাবে। এতে আপনার আধার নম্বরটি গোপন থাকে, ফলে জালিয়াতির সম্ভাবনা কমে শূন্যে এসে ঠেকে।

মাল্টি-প্রোফাইল অ্যাপ: নতুন আধার অ্যাপে এখন পরিবারের প্রধান নিজের ফোনেই সর্বোচ্চ ৫টি প্রোফাইল (বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তান) ম্যানেজ করতে পারবেন। এতে ডিজিটাল সাক্ষরতা কম এমন বয়স্ক সদস্যদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

ভোটার তালিকা ও ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ আতঙ্ক

পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে আধার ও ভোটার কার্ডের সংযোগ বর্তমানে একটি জ্বলন্ত ইস্যু। সম্প্রতি ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় রাজ্যে প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারের তথ্যে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ (Logical Discrepancy) পাওয়া গেছে।

বিষয়টি কী?

সহজ কথায়, তথ্যের অসামঞ্জস্য। যেমন—ভোটার তালিকায় বাবার বয়সের সঙ্গে সন্তানের বয়সের পার্থক্য ৫০ বছরের বেশি, কিংবা একই ব্যক্তির নাম ও বয়সে ভিন্ন নথিতে ভিন্ন তথ্য। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, আধার কার্ড কেবল পরিচয়ের প্রমাণ (Proof of Identity), এটি কোনোভাবেই নাগরিকত্বের প্রমাণ (Proof of Citizenship) নয়।

যাঁদের নাম এই সন্দেহের তালিকায়, তাঁদের করণীয় কী?

১. তালিকা চেক করুন: অবিলম্বে আপনার স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত ভবন, ওয়ার্ড অফিস বা ব্লক অফিসে প্রকাশিত তালিকা দেখুন।

২. সশরীরে না গিয়েও সমাধান: আপনি যদি বয়স্ক বা অসুস্থ হন, তবে নিজে না গিয়েও ‘বুথ লেভেল এজেন্ট’ (BLA)-এর মাধ্যমে আপনার সঠিক নথিপত্র জমা দিতে পারবেন।

৩. অতিরিক্ত সময়: তালিকা প্রকাশের পরেও যদি নাম বাদ যায়, তবে দাবি ও আপত্তি জানানোর জন্য অতিরিক্ত ১০ দিন সময় বরাদ্দ করা হয়েছে। আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক নথি জমা দেওয়াই একমাত্র সমাধান।

নতুন আবেদন ও এনরোলমেন্টের নিয়ম

নতুন আধার কার্ড তৈরির নিয়মেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সঠিক নথি না থাকলে এখন আর আধার কার্ড তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।

  • জন্ম তারিখের প্রমাণ: ২০২৩ সালের ১ অক্টোবরের পর যাঁদের জন্ম, তাঁদের আধার তৈরির জন্য বার্থ সার্টিফিকেট (Birth Certificate) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অন্য কোনো নথি এক্ষেত্রে গ্রাহ্য হবে না।
  • বিদেশি নাগরিকদের জন্য: বিদেশি নাগরিকরা ভারতে ১২ মাসে অন্তত ১৮২ দিন বসবাস করলে আধারের আবেদন করতে পারেন। তবে ওসিআই (OCI) কার্ড হোল্ডারদের জন্য আধারের মেয়াদ ১০ বছর ফিক্সড করা হয়েছে। অন্যদের ক্ষেত্রে ভিসা বা পাসপোর্টের মেয়াদের সঙ্গে আধারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।

প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও আগামীর প্রস্তুতি

মহারাষ্ট্রের সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তিগত ত্রুটি কীভাবে সাধারণ মানুষকে ভোগাতে পারে। সেখানে রাজ্য আইটি সার্ভারের (DIT) যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে প্রায় ১৫,০০০ ‘লিভ অ্যান্ড লাইসেন্স’ নথি আটকে পড়েছিল।

এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সহ অন্যান্য রাজ্যগুলো এখন স্থানীয় সার্ভারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি UIDAI-এর সঙ্গে ‘টেকনিক্যাল টাই-আপ’ করার পথে হাঁটছে। এর ফলে পুনে, মুম্বাই বা কলকাতার মতো মেট্রো শহরগুলোতে সার্ভার ডাউন থাকার সমস্যা ভবিষ্যতে আর হবে না বলে আশা করা যায়।

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আধার কার্ড কেবল একটি প্লাস্টিকের টুকরো নয়, এটি আপনার ডিজিটাল অস্তিত্বের প্রমাণ। ফি বৃদ্ধি বা নিয়মের কড়াকড়ি নিয়ে সমালোচনা থাকবেই, কিন্তু তথ্যের সুরক্ষা ও নির্ভুলতার স্বার্থে এই পরিবর্তনগুলো মেনে নেওয়া জরুরি।

Leave a Comment